আল কুরআনের বিস্ময়কর মুজিযা

আল কুরআনের বিস্ময়কর মুজিযা

আল কুরআনের বিস্ময়কর মুজিযা

উপক্রমনিকা (Introduction) আল্লাহ তায়ালা সকল নবি-রাসুলকে অলৌকিক বস্তু দান করেছেন তাদের যুগোপযোগী করে এবং তা ছিলো ক্ষণস্থায়ী।আর মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স.) -এর মু’জিযার যুগ কেয়ামত পর্যন্ত বিস্তৃত। এ কারণে তাঁর মু’জিযাও শাশ্বত ও চিরন্তন। আর আল কুরআন হলো তার শ্রেষ্ঠতম মু’জিযা। এ কিতাবের মু’জিযার চিরন্তনতা বিভিন্নমুখী।

‘মানাহিলু’ল -‘ইরফান’ গ্রন্থে কুরআনের চিরন্তন মু’জিযা সম্পর্কে বলা হয়েছে যে,“আমরা কুরআনের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে দেখতে পাই,বহু মু’জিযা-সংবলিত আল কুরআন চিরন্তন। যুগপরিক্রমায় তা বিলুপ্ত হয়নি এবং রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ইন্তেকালেও তা বিন্দু মাত্র পরিবর্তিত হয়নি।পবিত্র কুরআনের মু’জিযার কারণ ও দিকসমূহ (Reasons and aspects of Muziza in the Quran) :মহাগ্রন্থ আল কুরআন নিঃসন্দেহে বিশেষ অলৌকিক বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ও মু’জিযাসমৃদ্ধ গ্রন্থ। এক্ষেত্রে মানবিক যোগ্যতা ও দক্ষতা সম্পুর্ণ বিকল ও ব্যর্থ। এর মু’জিযার মোকাবিলা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা অসম্ভব। কেননা এ গ্রন্থের মু’জিযা বিভিন্নমুখী।

“আল্লামা তাক্বী”উসমানী কোরআনের মু’জিযাকে চারভাগে ভাগ করেছেম। যেমন (১) শাব্দিক মু’জিযা (২) বিন্যাসগত মু’জিযা (৩) পদ্ধতিগত মু’জিযা (৪) গাথুনিগত মু’জিযা।

মু’জিযা-সংক্রান্ত বিষয়ে ইসলামি পন্ডিত ও চিন্তাবিদদের মধ্যে বিভিন্ন মতবাদ রয়েছে।“আল্লামা কাযী ‘আয়ায (রহ.) বলেন, এর চুড়ান্ত মু’জিযা চারটি। আবার কুরতুবী (রহ.) বলেন, এর মু’জিযার সংখ্যা ১০টি। আবার অনেকের মতে, এর মু’জিযার সংখ্যা ৬০ টি।

‘আল্লামা ইবন সুরাকাহ-এর মতে, আল কুরআন এর মু’জিযার সংখ্যা হাজার হাজার। তন্মধ্যে কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্ময়কর মু’জিযার কারণ ও দিক নিম্নে বর্ণিত হলো :

) ভাষার অলংকার ও রচনাশৈলী তথা বালাগত ও ফাসাহাত(Ornaments and Contexture of the Language)

মহাগ্রন্থ আল কুরআন মু’জিযা হওয়ার অন্যতম কারণ ও দিক হচ্ছে, এর উন্নত মানের সাহিত্যিক অলংকারপূর্নতা, অনুপম রচনাশৈলী এবং নির্ভুল বাক্যের গাথুনি।’আল্লামা রাফে’ঈ তার ‘ই’জাযু’ল-কুরআন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, আল কুরআন ফাসাহাত এবং বালাগাতের মাধ্যমে বিশেষ বৈশিষ্ট্য মন্ডিত এবং এটা তিন পদ্ধতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। যেমন :(১) কুরআনের শাব্দিক ফাসাহাত (২) অর্থের ভিত্তিতে বালাগাত এবং (৩) শব্দবিন্যাস পদ্ধতির দৃষ্টিকোণে ফাসাহাত।এসব বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায় যে, এ গ্রন্থের সমগ্রটাই হলো মু’জিযা। এ গ্রন্থের অনুপম রচনাশৈলী ‘আরবদের রচনাশৈলী থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর। এটা কোনো গদ্যও নয়, আবার কোনো পদ্যও নয়। সাহিত্যশৈলীর বিচারে কুরআনের কোনো অন্ত্যমিল ও ছন্দের ওজন নেই,যা কবিতার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।আবার অছন্দ পদ্ধতির গদ্যও এটা নয়।বরং এ-গ্রন্থ হচ্ছে গদ্য ও পদ্যের মিশ্রণে বিশুদ্ধতম রচনা। এটাই হচ্ছে এ -গ্রন্থের মু’জিযা হওয়ার অন্যতম কারণ ও দিক।

২) অসংখ্য ভবিষ্যতবানী ও অদৃশ্য তথ্য পরিবেশন (Serving numerous predictions and invisible information

মহাগ্রন্থ আল কুরআন মু’জিযা হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে, এ গ্রন্থটি অদৃশ্য জগতের অনেক খবরদারি,বিগত যুগের অসংখ্য ও অগনিত কাহিনি উল্লেখ করেছে।এমন সব অদৃশ্য রহস্যের বর্ণনা ও ভবিষ্যতবানীর ভিত্তি একমাত্র ওহি ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। এ গ্রন্থে ঘোষিত ভবিষ্যতবানী হুবহু অক্ষরে অক্ষরে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে; একবিন্দু ও পরিবর্তন হয়নি।

৩) জাদুকরী আকর্ষণ, প্রভাব এবং সম্মোহনী শক্তি (Magical attraction, impact and hypnotic power)

পবিত্র কুরআনের আকর্ষণ ও প্রভাবশক্তি মু’জিযা হওয়ার অন্যতম কারণ। এ গ্রন্থের গাম্ভীর্যময় উচ্চারণ, ভাবগভীরতা,অলৌকিক, অতুলনীয় জাদুকরী সম্মোহনী শক্তিই হচ্ছে এর মৌলিক উপাদান। এ কিতাব তিলাওয়াতের সময় মানবীয় অন্তর বিগলিত হয়ে যায়। এর ভাষা, অলংকার,ছন্দ,রস ইত্যাদির অপূর্ব মধুময় ঝংকারে মানবহৃদয় স্বর্গীয় অনুভূতিতে ব্যাকুল হয়ে পড়ে। কালপরিক্রমায় এ-গ্রন্থের অমিয়বানীর ফলগুলো মানুষের মতে দাগ কেটেছে। এর আকর্ষণ ও সম্মোহনী শক্তি দিয়ে মানুষ কে তার প্রতি আকৃষ্ট করেছে। একমাত্র কুরআনের পবিত্র বানী শ্রবণ করেই অনেক কাফির আর অসংখ্য দুশমনই ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে। অসংখ্য মানুষ বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মদ (স.) -এর সুললিত কন্ঠে ও পবিত্র মুখঃনিসৃত মধুময় তিলাওয়াত শ্রবণ করে ইসলামের দীক্ষা গ্রহণ করেছে। ইসলামের ইতিহাস তথা আল কুরআন এর ঐতিহাসিক পটভূমিকায় রয়েছে এ ধরনের প্রচুর দৃষ্টান্তের অপূর্ব সমাবেশ। এক্ষেত্রে যুবায়ের ইবন মুত’ইম, কায়স ইবন নাসিরা,হযরত উছমান ইবনে মায’উন, হযরত সুয়েদ ইবনে সামিদ, যামাদ আযাদী, লবীদ ইবনে রাবিয়াহ, নাবিগাহ আহজাদী, প্রমুখ মনীষীর নাম উল্লেখযোগ্য। এ সকল ব্যক্তি পবিত্র কুরআনের মর্মস্পর্শী ধ্বনি, মধুমাখা বাক্যের সৌন্দর্য ও সুমিষ্ট আয়াতসমূহে মোহিত ও বিস্মায়াভিভূত হয়ে পড়ত। এমনকি কত মানুষ এর অনবিল ঐকতানে আকৃষ্ট হয়ে, মোহবিষ্ট মন্ত্রমুগ্ধের মতো এ-র তিলাওয়াত শুনে অতৃপ্ত আত্মাকে পরিতৃপ্ত ও শান্ত করত।

৪)প্রাচীন জাতিগোষ্ঠী ও জনপদের বর্ণনা (Description of Ancient Population and Towns)

প্রাচীন জাতিগোষ্ঠী ও জনপদের বিস্তারিত আলোচনা, সঠিক ইতিহাস, উউত্থান-পতনের মর্মস্পর্শী ঘটনাবলি এবং কাহিনীর উপস্থাপনা হচ্ছে পবিত্র কুরআনের অন্যতম মু’জিযা। কেননা এ গ্রন্থ বিভিন্ন জনপদ, জাতি, সভ্যতার উন্নতি ও অবনতি,উৎকর্ষ ও ধ্বংসের হৃদয়গ্রাহী বিবরণ বিস্তারিত ও পরিপূর্ণ তথ্য-সহকারে তুলে ধরেছে। এসব এসব সুদৃঢ় তথ্যসংবলিত কাহিনি ও ঘটনার বিবরণ এমন এক ব্যক্তি উপস্থাপন করেছেন, যিনি কোনো কবি,সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক নন এবং বিগত কোনো ঘটনা সম্পর্কে তিনি অবহিত ছিলেন না।

৫) হুরুফে মুকাত্তা’আত তথা বিচ্ছিন্ন বর্ণ ( Detached Letter)

পবিত্র কুরআনের মহাবিস্ময়কর মু’জিযা হচ্ছে, এ গ্রন্থে বর্ণিত কতিপয় সূরার প্রারম্ভে ব্যবহৃত হুরুফে মুকাত্তা’আত(বিচ্ছিন্ন বর্ণগুলো), যার ব্যাখ্যা ও গুরুত্ব, তাত্ত্বিক রহস্য ও সুস্পষ্ট বিশ্লেষণ মানুষের স্বল্প জ্ঞানের চিন্তাবহির্ভূত ও সাধ্যাতীত ব্যাপার। এর প্রকৃত ব্যাখ্যা একমাত্র আল্লাহ তা’য়ালা অবহিত আছেন। ‘তাফসীরে ফাতহু’ল-কাদীর ‘ গ্রন্থে বলা হয়েছে, “এটাই আল্লাহর গোপন রহস্য।প্রত্যেক আসমানি গ্রন্থেই আল্লাহর গোপন রহস্য বিদ্যমান এবং এটা মুতাশাবিহির অন্তর্ভুক্ত। ” সুতরাং হুরুফে মুকাত্তা’আত আল-কুরআনের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ মু’জিযার অধিকারী। ‘আল্লামা বাকিল্লানী (রহ.) বলেন, এর অন্তর্ভুক্ত মোট হরফের সংখ্যা ২৯টি এবং এর মধ্যে হুরুফে মুকাররার মোট ১৪টি।’

৬) ভাষার সাবলীলতা ও অলংকার (Fluency and Ornaments of language)

পবিত্র কুরআনের আরেকটি মু’জিযা হলো ভাষার সাবলীলতা ও অলংকার সর্বত্র সমানভাবে বিদ্যমান। সমগ্র কুরআন খুঁজে কোথাও এমন একটি আয়াতও পাওয়া যাবে না যার ভাষা সাবলীল নয়। কিন্তু কোনো মানুষের পক্ষে এটা সম্ভবপর নয় যে, তার বক্তব্যের শুরু হতে শেষ পর্যন্ত সর্বত্র ভাষার সুললিত সৌকুমার্য, সাবলীলতা বা অলংকার সমানভাবে বিদ্যমান

৭) বাচনভঙ্গির অভিনবত্ব (Modern Utterance)

এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, আল কুরআনের বর্ণনারীতি ও বাচনভঙ্গি অন্যান্য ভাষাবিদ ও অলংকারবিদদের বর্ণনারীতি হতে সম্পূর্ণ অভিনব ও বিস্ময়কর। আয়াতের সমাপ্তি ও মিলনবিন্যাস সম্পূর্ণ নতুন ধরনের। কুরআনের পুর্বে অন্য কোনো রচনায় যেমন এর নজির পাওয়া যায় না, তেমনি এ গ্রন্থের পরবর্তী কোনো গ্রন্থেও এর নমুনা পরিদৃষ্ট হয় না এবং হবেও না।এর এ অভিনব ও অপূর্ব বাচনভঙ্গি দেখে ‘আরব ভাষাবিদগণ বিস্মিত ও আকর্ষিত হয়ে কুরআনের আদর্শে উজ্জীবিত হয়েছিলেন। মুফাসসিরীন, ফুকাহা ও আলেমগণের মতে, আল-কুরআনের বর্ণনাশৈলীও একটি মু’জিযা।

৮) শব্দগত মু’জিযা (Literary Muziza)

পবিত্র কুরআনের শব্দচয়নে এমন অভূতপূর্ব রীতি গ্রহণ করা হয়েছে, যা মানবীয় শক্তি-সামর্থ্যের বহির্ভূত। যেমন এ গ্রন্থে এমন কিছু শব্দ আছে, যেগুলো শুধু বহুবচন রুপেই ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরুপ:আল-আলবাব, আল-কাওয়াকিবু, আল-আরজা প্রভৃতি শব্দসমূহ।কুরআনের সব জায়গায় এ শব্দগুলো বহুবচন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু অপরদিকে, আল-আরদু শব্দটি একবচন রুপে ব্যবহৃত হয়েছে এবং কুরআনের আল-মাউতু ও আত- তাওয়াফফা শব্দদ্বয়ের তাত্ত্বিক প্রয়োগ পদ্ধতিতেও মু’জিযা বিদ্যমান। এ গ্রন্থের প্রতিটি শব্দই প্রকাশ করে থাকে তার সুনির্দিষ্ট ও সার্থক অর্থ।অতএব বলা যায় যে, এ গ্রন্থে বর্ণিত শব্দগুলো যেন একটা অঙ্গবিশেষ, আর অর্থ হচ্ছে এর রুপ তথা আত্মা।

৯) মুখস্থকরণে সহজলভ্যতা(Smoothness in Memorization)

পবিত্র কুরআন মু’জিযা হওয়ার অন্যতম কারণ ও দিক হচ্ছে এর ভাষা বোঝা,উপলব্ধি করা, স্মরণ রাখা এবং মুখস্তকরণের সহজলভ্যতা। এ মহামান্বিত গ্রন্থের ভাষা এতই প্রাঞ্জল ও মোহনীয়, যার অর্থ না-বুঝেও আদ্যোপান্ত অনায়াসে মুখস্ত করে নেওয়া যায়। একমাত্র এ-কারণেই আজ বিশ্বের অন্য কোনো গ্রন্থের নয় বরং শুধু আল্লাহর নাযিলকৃত আল কুরআনেরই লক্ষ লক্ষ সম্মানিত হাফেয রয়েছেন। সুতরাং এটা নিঃসন্দেহে একটি আসমানি গ্রন্থ এবং হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর একটি জীবন্ত মু’জিযা।

১০) বিষয়সমূহের মধ্যে বিরোধ ও বিভ্রান্তি না থাকা(Absence of Dispute and confusion in matters)

আল কুরআনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা, গাম্ভীর্যপূর্ণ শব্দ, প্রাঞ্জল, সাবলীল, স্বচ্ছ ও সংগতিপূর্ণ আয়াতের মাধ্যমে বহু বিষয়ের আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনোরুপ নুন্যতম বিরোধ, বিভ্রান্তি, জড়তা,কমতি,মাত্রাতিরিক্ততা,বৈপরীত্য-মতভেদ পরিলক্ষিত হয় না। এটা মানুষের বর্ণনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। অর্থগত-শব্দগত উভয় দিক থেকে এটি পূর্ণসামঞ্জস্যশীল। এটাই হলো কুরআনের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ মু’জিযার একটি।

১১) স্থায়িত্ব ও চিরন্তনতা(Stability and Immortality)

আল কুরআন মু’জিযা হওয়ার অন্যতম আরেকটি কারণ ও দিক হচ্ছে এটা কোনো সাময়িক বা আকস্মিক মু’জিযা নয় বরং এটা শাশ্বত এবং চিরন্তন একটি মু’জিযা। অনন্তকাল পর্যন্ত এ গ্রন্থ অনন্যসাধারণ মু’জিযাগ্রন্থ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে। এ মু’জিযার উপর কালের কোনো প্রভাব প্রতিফলিত হবে না। কালের গতিধারা কুরআনের মু’জিযার গুরুত্বকে হ্রাস করতে পারবে না এবং এর কল্যাণকারিতাকেও কমাতে পারবে না ভাষার অলংকার ও সাবলীলতা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের যত উন্নতিই হোক না কেন, এ কিতাবের রুপগত, অর্থসংক্রান্ত মু’জিযা এবং অলৌকিকতার কোনো দুর্বলতা অনুভূত হবে না। ফলে এর শব্দ,বাক্য এবং অর্থসহ কোনো কিছুর মধ্যে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন এবং কোনো অতিরঞ্জন প্রবেশ করবে না।

১২) পুনঃপুন পাঠের স্বাদ ও আকর্ষণ (The Taste and Attraction of Repeated Reading)

কোনো রচনা যতই সাবলীল ও অলংকারপূর্ণই হোক না কেন, মানুষ সেটাকে একবার পড়া অথবা শোনার পর দ্বিতীয় বার সেটাকে শুনতে বা পড়তে আগ্রহান্বিত হয় না বরং এটার প্রতি একপ্রকার বিতৃষ্ণার সৃষ্টি হয়। কিন্তু পৃথিবীতে একমাত্র গ্রন্থ হলো আল কুরআন যা বারংবার পাঠ করা বা শোনার পর নতুন আনন্দ বা পুলক এবং হৃদয়ের স্পন্দন লাভ করা যায়। অনবরত তিলাওয়াত করলেও মানুষের মনে কোনো বিরক্তির সৃষ্টি হয় না ; বরং যত বেশি পাঠ করা হয়,ততই তার প্রতি আগ্রহ ও ব্যাকুলতা বাড়তে থাকে। শুধু তাই নয়, অন্যের তিলাওয়াত শুনলেও মনে গভীর তন্ময়তা ও অপরিমেয় আগ্রহ জন্মায়। এটাই হলো পবিত্র কুরআনের মু’জিযা তথা অলৌকিকতা।

১৩) অপূর্ব গ্রন্থাবদ্ধতা ও অভূতপূর্ব সংরক্ষণ পদ্ধতি (Wonderful Book Format and Unprecedented Preserving Method)

আল কুরআনের বিস্ময়কর গ্রন্থাবদ্ধতা এবং অভূতপূর্ব সংরক্ষণ পদ্ধতি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। বিশ্বে পুরাতন ধর্মীয় গ্রন্থ গুলোর মধ্যে যেগুলো আজও বিদ্যমান, তার মধ্যে এ গ্রন্থই বিশেষ বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ। এর লিপিবদ্ধকরণ ও গ্রন্থাবদ্ধতার কৌশল এবং সংরক্ষণ পদ্ধতি প্রকৃতই অলৌকিক ও মু’জিযাপূর্ণ। এর বর্ণনার ধরন ও পদ্ধতি ম সাধারণ মানবীয় বর্ণনার ধরন-বিবর্জিত। এর কোনো তুলনা নেই।

১৪)সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়াদির বর্ণনা (The description of The Small and The Slightest Matter):আল কুরআন মহাসত্যের অকাট্য প্রমাণস্বরুপ। আবার এটাও স্বয়ং প্রমাণিত সত্য। এর শব্দের বিন্যাস, ছন্দময় অপূর্ব মিলন, বাক্যের জাদুকরী উৎকর্ষ ইত্যাদির মধ্যে আল্লাহর সৃষ্টি রহস্যের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়সমূহের আলোচনা এসেছে। এজন্যে সমকালীন ‘আরবের পন্ডিত, ভাষাবিদ ও সাহিত্যিকরা তাদের ভাষা প্রয়োগের মাধ্যমে কুরআনের জবাব দিতে ব্যর্থ হয়েছিলো। কারণ এ গ্রন্থে তাশবীহ, ইসতিআরাহ,ইজায ও তামছিল ইত্যাদির মাধ্যমে অসংখ্য সুক্ষ্ম বিষয় বর্ণনা করেছে ; যা তাদের পক্ষে ছিলো অসম্ভব। এটাই হলো কুরআনের অন্যতম মু’জিযা।

১৫) চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক বিপ্লব সাধন(Characteristic and Spiritual Revolution) : আল কুরআন এর সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ মু’জিযা এই যে, এটা বর্বর ও জাহিল-মুর্খ ‘আরবদের মধ্যে চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক বিপ্লব সাধন করে তাদের সভ্যতা ও মনুষ্যত্বকে উন্নতির চরম শিখরে উন্নীত করেছিল। তাদের একটি পৃথক সাম্রাজ্য, একটি পূর্নাঙ্গ বিধান ও একটি পূর্নাঙ্গ শরি’আত প্রদান করেছিল। এ গ্রন্থের ভাষাকে একটি চিরন্তন ও বিশ্বজনীন ভাষার মর্যাদা প্রদান করেছিল।আবু ইয়াকুব আস-সাক্কাকী (রহ.) বলেন, আল কুরআনের মু’জিযার ব্যাখ্যা তথা বিশ্লেষণ সম্ভবপর নয়।এটা উপলব্ধি করা যায় কিন্তু সুষ্ঠুভাবে বিশ্লেষণ করা যায় না। যেমন :কোনো শব্দরুপের বিশুদ্ধতা অনুভব করা যায় কিন্তু এটা ভাষায় সম্যক বর্ণনা করা যায় না। তেমনি কোনো কোনো জিনিসের সৌন্দর্য উপলব্ধি করা যায় কিন্তু এটা প্রকাশ করা এতো সহজ নয়। ভাষা সাহিত্য ও অলংকারশাস্ত্রে বুতপত্তি অর্জনের এবং সুস্থ অনুভূতির ভিত্তিতে কুরআনের মু’জিযা উপলব্ধি করা যায়। আসলে পবিত্র কুরআনের প্রত্যেকটি বিষয়ই মু’জিযা। আল্লাহর কিতাবের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, গূঢ় তত্ত্ব ও রহস্যের জ্ঞানার্জন এবং অনুধাবন করা মানুষের শক্তিবহির্ভূত ব্যাপার। এজন্য এ গ্রন্থের সমতুল্য একটি আয়াত ও সমগ্র মানবজাতি তৈরি করতে পারবে না।

উপসংহার (Conclusion): উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মহাগ্রন্থ কুরআনুল কারিম একটি অলৌকিক গ্রন্থ যা মহান আল্লাহর নাযিলকৃত। এটি সকল জ্ঞানের চূড়ান্ত আধার। এর সত্যতা স্বীকার করে বসওয়ার্থ স্মিথ (Bosworth Smith) এ প্রসঙ্গে বলেন,“The Quran is a book which is poem, a code of laws, a book of common prayer, all in one and is reverenced by a large section of human race, as miracle of purity of style, of wisdom and truth. It is a miracle claimed by Muhammad (sm.), his standing miracle He called it and miracle indeed it is. – আল কুরআন এমন একটি গ্রন্থ, যা একাধারে কাব্যগ্রন্থ, আইনশাস্ত্র, প্রার্থনা পুস্তক এবং আজও পৃথিবীর এক পঞ্চমাংশ অধিবাসী যাকে নিখুঁত রচনাকৌশল, জ্ঞানগর্ভতা ও সত্য জ্ঞানের প্রেরণার দিক দিয়ে অলৌকিক বলে শ্রদ্ধা করেন।

তথ্যসুত্র:

  1. Noman Daniel, Islam and the west, p.72-77
  2. Mr.Maim al Humeri, The history of the idea of the Izaz of the Quran, p.27
  3. কুরআন ও হাদিস সংক্রান্ত – Faith and Theology (faith-and-theology.com)
  4. Faith & Theology | Facebook
Facebook
Twitter
LinkedIn
Telegram
WhatsApp

Leave a Comment

Your email address will not be published.

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ

সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

Category