নবী মুহাম্মদ(সাঃ) কি পাপি ছিলেন বা পাপ করেছিলেন?

নবী মুহাম্মদ(সাঃ) কি পাপি ছিলেন বা পাপ করেছিলেন?

আমরা প্রায়শই খ্রিস্টানদের দেখতে পাব যে তারা নবী মহুাম্মদ(সা.) নির্দোষ ছিলেন না এবং হযরত ঈসা আঃ
নির্দোষ ছিলেন তা প্রমাণ করার জন্য অনেক কষ্ট করেন । প্রকৃতপক্ষে, ঈসা (আঃ) এবং নবী মহুাম্মদ(সা.) সহ
সকল নবীই নিষ্পাপ ছিলেন এবং কখনও কখনও তাদের দ্বারা করা কিছুভুল বা ত্রুটি পাপ ছিল না।
নিম্নলিখিত নিবন্ধে আমরা পুরো জিনিসটি ব্যাখ্যা করব এবং আরেকটি খ্রিস্টান মিসোনারিদের মিথ্যাকে
প্রকাশ করব ইনশাল্লাহ।

কিছু কুরানের আয়াত যেগুলো দেখিয়ে খ্রিস্টান মিসোনারিরা এসব দাবি করেন :

অতএব আপনি ধৈর্য ধারণ করুন; নিশ্চয় আল্লাহ্র প্রতিশ্রুতি সত্য। আর আপনি আপনার ক্রটির জন্য
ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং আপনার রবের সপ্ৰশংস পবিত্রতা-মহিমা ঘোষণা করুন সন্ধ্যা ও সকালে।
(৪০ঃ৫৫)

কাজেই জেনে রাখুন যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই। আর ক্ষমা প্রার্থনা করুন আপনার ও
মমিু ন নর-নারীদের ত্রুটির জন্য। আল্লাহ্ তোমাদের গতিবিধি এবং অবস্থান সম্পর্কে অবগত রয়েছেন।
(৪৭ঃ১৯)

কাজেই জেনে রাখুন যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই।(১) আর ক্ষমা প্রার্থনা করুন আপনার
ও মমিু ন নর-নারীদের ত্রুটির জন্য। আল্লাহ্ তোমাদের গতিবিধি এবং অবস্থান সম্পর্কে অবগত
রয়েছেন।(৪৮ঃ২)

নম্রতা এবং বিনয়ের প্রতীক

ইসলাম মানষুকে যে নৈতিকতার শিক্ষা দেয় তার মধ্যে একটি হল: মানষু যতই কঠোর ও আন্তরিকতার সাথে
তার প্রভুর সেবা ও উপাসনা করার চেষ্টা করুক এবং তার ধর্মেরর্মে জন্য লড়াই ও সংগ্রাম করুক না কেন, সে
যে ভুল বোঝাবঝিু তে লিপ্ত হবে না তা কখনোই তার ভাবা উচিত নয়। এবং তার যা করার প্রয়োজন ছিল
তা সম্পন্ন করেছেন এমন ভাবাও উচিৎ নয় । বরং, তার মনে হওয়া উচিত যে তার প্রভুও প্রভুর কাছ
থেকে তার কাছে যা আশা করা হয়েছিল তার সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার সে করতে পারেনি। অতএব, তার উচিত
ক্রমাগত তার ভুল স্বীকার করা এবং আল্লাহর কাছে এই বলে প্রার্থনা করা, ‘হে প্রভু, আপনার খেদমতে আমি
যে ভুল-ত্রুটি করে থাকি তার জন্য আমাকে ক্ষমা করুন।” এটা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর নির্দেশের সারমর্ম: ‘ র্ম হে
নবী! আপনার দোষের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন..’ এবং হাদিসে আমরা দেখতে পাই মহানবী (সা.) ঠিক একই
লাইনে প্রার্থনা করছেন,

যেমনঃ

ইবন আবূমসা (রহঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণীত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ দুয়া করতেন,
হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমা করে দিন আমার অনিচ্ছাকৃত গুনাহ, আমার অজ্ঞতা, আমার কাজের সকল
বাড়াবাড়ি এবং আমার যেসব গুনাহ আপনি আমার চেয়ে অধিক জানেন। (বখা ু রিঃ৬৩৯৮) [৬৩৯৯;
মসুলিম ৪৮/১৮, হাঃ ২৭১৯, আহমাদ ১৯৭৫৯] (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৯৫০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন৫৮৪৩)

এর অর্থ এই নয় যে মহানবী (সাঃ) আসলে ইচ্ছাকৃতভাবে কোন ভুল করেছিলেন, বরং এর সঠিক অর্থ হল
যে, যে বান্দা তার প্রভুর সবচেয়ে বড় ইবাদতকারী তার জন্যও এটা শোভনীয় ছিল না যে সে তার কৃতিত্বের
অহংকারের একটি আভাও রাখবে। কিন্তু তার আসল অবস্থানও হবে যে তার সমস্ত মহান এবং মহিমান্বিত
সেবা সত্ত্বেও তার প্রভুর সামনে তার ত্রুটিগুলি স্বীকার করা অব্যাহত রাখা । মনের এই অবস্থাতেই মহানবী
(সা.) প্রায়শই তার প্রভুর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন।

আমাদের বঝু তে হবে যে যার সম্মান ও দায়িত্ব বেশি তার জন্য স্টান্ডার্ড ও ভিন্ন। মহানবী (সা.)
সর্বশক্তিমান আল্লাহ থেকে সরাসরি অহি পেয়েছিলেন তাই তিনি ছিলেন সর্বস্রেষ্ট মানব এবং এমন সময়ে
যখন তিনি প্রকৃতপক্ষে কোন অন্যায় করেননি যেমনটি আমরা দেখতে পাচ্ছি, তখনও তার জন্য নির্ধারিত
উচ্চ স্তরের কারণে তাকে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল।
আরও, একটি হাদিস রয়েছে যা উত্তর দেয় যে কেন নবিজি সা. আল্লাহর কাছে এত প্রার্থনা করেছিলেন এবং
তাঁর রহমত কামনা করেছিলেন:

মগীরাহ ু (রাঃ) হতে বর্ণিত। র্ণি তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত অধিক সালাত আদায়
করতেন যে, তাঁর পদযুগল ফুলে যেতো। তাঁকে বলা হলো, আল্লাহ্ তো আপনার অতীত ও ভবিষ্যতের
ত্রুটিসমহূ মার্জনা করে দিয়েছেন। তিনি বললেন, আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না?(বখা ু রিঃ৪৮৩৬)
(আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৪৭০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৪৭৩)

অনুসারিদের জন্য শিক্ষ্যা
মহানবী (সা.) তাঁর বিনয়ের নিদর্শন হিসেবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন এবং তাঁর সাহাবী ও
অনুসারিদের তা করার শিক্ষা দিতেন।

আবূহুরাইরাহ (রাঃ) বর্ণনা র্ণ করেন, আমি রাসূলল্লুাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ
আল্লাহর শপথ! আমি প্রতিদিন আল্লাহর কাছে সত্তরবারেরও অধিক ইস্তিগফার ও তওবা করে
থাকি।(বুখারিঃ৬৩০৭) (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৮৬২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৭৫৪)

অন্য একটি বর্ণনা এটিকে একেবারে স্পষ্ট করে দেয় যে তিনি বিনয়ের প্রতীক হিসাবে এবং আরও
গুরুত্বপূর্ণভাবে তাঁর অনুসারিদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য এইভাবে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন:

ইবনে উমর (রাঃ) বর্ণনা র্ণ করেন, আমি আল্লাহর রাসূলকে বলতে শুনেছি, হে লোকেরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা
প্রার্থনা কর, আমি দিনে একশত বার ক্ষমা প্রার্থনা করি।(মুসনাদে আহমেদ)

উপরের হাদিসের কথাই প্রমাণ করে যে তিনি তাঁর অনুসারিদেরকে প্রায়শই আল্লাহর কাছে তওবা করতে
উদ্বদ্ধু করার জন্য এটি করেছিলেন এবং বলেছিলেন।

আরেকটি মজার বিষয় এখানে আমাদের বিবেচনা করতে হবে যে, উপরে উদ্ধৃত কোরান ৪৮ঃ২ যা বলে যে
মহানবী (সা.)-এর অতীত ও ভবিষ্যত সমস্ত পাপ ক্ষমা করা হয়েছে তা হিজরতের পর ৬ষ্ঠ বছরে নাজিল
হয়েছিল । আবুহুরায়রা, যিনি এই ঘটনার বর্ণনাকারী , হাদিসে বলেছেন যে মহানবী (সা.) দিনে ৭০ বার
তওবা করেছেন, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন হিজরতের পর ৭ম বছরে এবং তারপর মহানবীর কাছে
আসেন। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে আয়াতটি নাযিল হওয়ার পরও মহানবী (সাঃ) দোয়া করেছেন। এটা
প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট যে এটি কেবল বিনয়ের খাতিরে ছিল এবং অনুসারিদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য।

একটি পাপের উদাহারন

মহানবী (সা.)-কেও একবার উপদেশ দেওয়া হয়েছিল এবং সেই একটি ঘটনা স্পষ্টভাবে দেখায় যে বিষয়টি
কী ছিল। এটি কোরান ৮০ঃ১-১০ এ বলা হয়েছে।

১. তিনি ভ্ৰকুঞ্চিত করলেন এবং মখু ফিরিয়ে নিলেন ২. কারণ তার কাছে অন্ধ লোকটি আসল।৩. আর কিসে
আপনাকে জানাবে যে, —সে হয়ত পরিশুদ্ধ হত,৪. অথবা উপদেশ গ্ৰহণ করত, ফলে সে উপদেশ তার
উপকারে আসত। ৫. আর যে পরোয়া করে না, ৬. আপনি তার প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন।৭. অথচ সে নিজে
পরিশুদ্ধ না হলে আপনার কোন দায়িত্ব নেই,৮. অপরদিকে যে আপনার কাছে ছুটে এলো,৯. আর সে
সসঙ্কচিত্ত,১০. আপনি তার থেকে উদাসীন হলেন; (কুরআন৮০ঃ১-১০)

এমনটি ঘটেছিল যে, মহানবী (সা.) মক্কার কিছুনেতার সাথে কথা বলছিলেন যারা ইসলাম গ্রহণ করেননি
এবং তখন তাঁর একজন সাহাবী ইবনে উম্মে মাকতুম এসেছিলেন এবং মহানবী (সা.) সেই সময় তাঁর প্রবেশ
অপছন্দ করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে মহানবী (সা.) মনে করতেন যে, যাদের সাথে কথা বলছিলেন তাদের মধ্য
থেকে একজন ব্যক্তিকেও যদি সঠিক পথে আনতে পারে ,তার কথা শোনে এবং সঠিক পথে পরিচালিত হয়,
তাহলে ইসলামকে শক্তিশালী করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। অতএব, তার সঙ্গীদের কেউ সে
সময় বাধা দেবেন না; যদি তারা কিছুজিজ্ঞাসা করতে বা শিখতে চায় , পরবর্তী সময়ে জিজ্ঞাসা করতে বা
শিখতে পারবেন।
এই শৈলী দ্বারা মহানবী (সা.) কে একটি সূক্ষ্ম পদ্ধতির দ্বারা উপলব্ধি করানো হয়েছে যে এটি তাঁর জন্য
একটি অপ্রীতিকর কাজ। যদি তার উচ্চ নৈতিকতার সাথে পরিচিত কেউ এটি প্রত্যক্ষ করতেন, তবে তিনি
ভাবতেন যে এটি তিনি নন, অন্য কেউ এই আচরণ করেছেন।
সুতরাং, এটি এমন একটি কাজ যা মহানবী (সা.) করেছিলেন এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে এটি অপছন্দ
ছিল। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে মহানবী (সাঃ) এর উদ্দেশ্য ছিল পাপ করা এবং কাউকে আঘাত করা নয়
কিন্তু আল্লাহ জানেন যে নবীর সাথে যারা কথা বলছে তারা আন্তরিক নয় বরং যে অন্ধ লোকটি এসেছিল সে
ছিল আন্তরিক। এবং তাই তাকে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল।
এটি একটি সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ যে, মহানবী (সা.)-এর জন্য মানদণ্ড অনেক বেশি ছিল। এবং তাই যাকে ‘পাপ’
বলা হয় তা কেবলমাত্র এতটাই হয় যখন এটি সমস্ত মানষেু র মধ্যে সবচেয়ে নিখুতঁ হয়।

এইবার একটু টুইস্ট হোক

খ্রিস্টানরা যে কোরআনের আয়াতগুলোকে ভুল ব্যাখ্যা করে সেগুলি ব্যাখ্যা করার পর, এখন আমরা
বাইবেলে আসি এবং এটি আমাদের যীশু খ্রিস্ট (সাঃ) সম্পর্কে কী বলে যাকে খ্রিস্টানরা পবিত্র মানষু বা নিখুতঁ
মানষু নয় বরং ঈশ্বরের অবতার হিসেবে গ্রহণ করে।

মথি ৬ঃ১২ তে বলা হচ্ছে যে যিশু পিতার কাছে পার্থনা করেছিলেন যে, “আর আমাদের অপরাধ সকল ক্ষমা
কর, যেমন আমরাও আপন আপন অপরাধীদিগকে ক্ষমা করিয়াছি”;

একমত যে আয়াতের প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছে যে তিনি তার শিষ্যদের এইভাবে প্রার্থনা করতে বলেছিলেন
কিন্তু বাইবেল প্রমাণ করে যে তিনি নিজে প্রায়শই ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন এবং এটি কোথাও বলেনি
যে তিনি ভিন্নভাবে প্রার্থনা করেছিলেন।

আর যীশু (আঃ) জন ব্যাপটিস্ট দ্বারা বাপ্তিস্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং আমরা জন ব্যাপটিস্ট সম্পর্কে জানি;
“এবং তিনি জর্ডান থেকে এসেছিলেন, পাপের ক্ষমার জন্য অনতা ু পের বাপ্তিস্ম প্রচার করেছিলেন।” (লকু
৩ঃ৩)

এখন খ্রিস্টানরা এখানে দটিু পদক্ষেপ নিতে পারে; হয় তারা যুক্তি দিতে পারে যে এটি শুধুমাত্র রূপক অর্থে
অথবা শিষ্যদের এবং পরবর্তী অনুসারীদের জন্য একটি পাঠ হিসেবে বলা হয়েছে । আমাদের, মুসলিমদের
কাছে এই ব্যাখ্যা নিয়ে কোন সমস্যা নেই কিন্তু এটি শুধুমাত্র খ্রিস্টানদের ডাবল স্টান্ডার্ড উন্মোচিত করে।

যীশু খ্রীষ্ট, ‘ঈশ্বর অবতার’ এবং একজন ‘ঈশ্বর’ যদি স্বয়ং তার পাপের ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারেন এবং
অনুতাপের ব্যাপস্টিজম নিতে পারেন তবে নবী মুহাম্মদের মধ্যে কেন সমস্যা পেলেন যিনি কেবল মানষু
ছিলেন, তিনিও একই কাজ করেছেন । কি সুন্দর ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ।

খ্রিস্টান মিসোনারিদের এহেন আচরণ আমাকে যিশু খ্রিষ্টের ২ টি কথা মনে করিয়ে দেয়।
ভণ্ড! প্রথমে তোমার নিজের চোখ থেকে তক্তাটা বার করে ফেলো, তাহলে তোমার ভাইয়ের চোখ থেকে
কুটোটা বার করার জন্য স্পষ্ট দেখতে পাবে।(মথি ৭ঃ৫)
অন্ধ পথপ্রদর্শক তোমরা! তোমরা মশা ছাঁকো, কিন্তু উট গিলে ফেলো।(মথি২৩ঃ২৪

Facebook
Twitter
LinkedIn
Telegram
WhatsApp

Leave a Comment

Your email address will not be published.

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ

সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

Category