মহাবিশ্ব কি অসীম?

মহাবিশ্ব কি অসীম?

মহাবিশ্ব কি অসীম? 

অসীম বলতে, সীমাহীন,অন্তহীন বা যে কোনো সংখ্যার চেয়ে বড় কিছুকে বুঝায়।  বিগ ব্যাং থিওরী অনুযায়ী আমাদের মহাবিশ্বের একটা শুরু আছে। আমাদের মহাবিশ্ব ক্রমাগত সম্প্রসারণ হচ্ছে। এবং একটা সময়ে গিয়ে মহাবিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাবে। যেহেতু আমাদের মহাবিশ্বের একটা শুরু ও শেষ আছে সেহেতু মহাবিশ্ব অসীম নয়। কিন্ত অনেকেই অসীম মহাবিশ্ব এই ধারণাকে যৌক্তিক মনে করে। তাদের মতে মহাবিশ্ব অস্তিত্বে আসার পিছনে অসীম সংখ্যক কারণ রয়েছে। যেহেতু মহাবিশ্ব অস্তিত্বে আসার জন্য অসীম সংখ্যক কারণ রয়েছে সেহেতু মহাবিশ্বের কোনো শুরু নেই। এবং মহাবিশ্ব অস্তিত্বে আসার জন্য কোনো সৃষ্টিকর্তা বা অতিপ্রাকৃতিক সত্তারও প্রয়োজন নেই। তবে তাদের এই দাবী মোটেও যৌক্তিক নয়।

অসীম মহাবিশ্ব ?

ফিলোসফিতে দুই ধরণের অসীম বা ইনফিনিটির ধারণা পাওয়া যায়।

1. Potential Infinity [1]Potential Infinite v. Actual Infinite | Aristotle (middlebury.edu)

2. Actual Infinity [2]Potential Infinite v. Actual Infinite | Aristotle (middlebury.edu)

Potential Infinity ( সম্ভাব্য অসীম )

Potential Infinity বা সম্ভাব্য অসীম বলতে বুঝায়, যা শেষ না করেই চলতে থাকে। অর্থাৎ, ভবিষ্যৎ এর দিকে চলতেই থাকবে। কখনোই শেষ হবেনা। ইনফিনিটি বাস্তবে এক্সিস্ট করেনা। এটা কেবলই একটা ধারণা। আপনি ইনফিনিটি কে ইনফিনিটি দিয়ে গুণ করলে, বিয়োগ করলে ইনফিনিটিই আসবে। কখনোই ফাইনেট আসবেনা।

উদাহারণ স্বরূপ, ভবিষ্যতে অসীম সংখ্যক দিন রয়েছে। কিন্তু অসীম যদি নাই থাকে, আমরা কেন বলি অসীম সংখ্যক দিন ? দেখুন আমরা চাইলে একটা দিনের পর আরেকটা দিন যোগ করে অসীম সংখ্যক দিনে পৌঁছাতে পারবো ! কিন্তু সেটা আসলে অসীম না! আমরা হয়তো একটার পর একটা যোগ করতে করতে এক হাজার বা দুই হাজার সংখক দিন পর্যন্ত যোগ করতে পারবো! কিন্ত একটা সময় গিয়ে আমরা আর কাউন্ট করতে পারবেন না বিধায় বলি অসীম সংখ্যক দিন! কিন্তু সেটা আসলে অসীম না! মূলত আমরা গণনা করতে পারিনা বিধায় বলি অসীম।

আরেকটি উদাহারণ খেয়াল করুন, আপনি একটা মুদ্রার সাথে আরেকটা মুদ্রা যোগ করে কখনোই অসীমে পৌঁছাতে পারবেন না! আপনি হয়তো একটা পর একটা যোগ করে কয়েক হাজার পর্যন্ত যেতে পারবেন! ধরুন আপনি কয়েন মিলিয়ন পর্যন্ত গেলেন! কিন্তু এরপর আর কাউন্ট করা পসিবল না বিধায় আমরা বলবো অসীম সংখ্যক কয়েন। কিন্তু সেটা অসীম না!

Actual Infinity (প্রকৃত অসীম ) 

Actual Infinity বা প্রকৃত অসীম বলতে বুঝায়, যার শুরু কি-বা শেষ নেই। অধিকাংশ ফিলোসফার ও সাইন্টিস্টরা একমত যে ইনফিনিটি কখনোই রিয়েলিটিতে এক্সিস্ট করেনা।  

মনে করুন আপনি সকালে ভার্সিটি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন। তো আপনার আম্মু আপনাকে শর্তদিলো যে অসীম সংখ্যক প্লেট পরিষ্কার করতে না পারলে আপনি বাসা থেকে বের হতে পারবেন না। আপনি হয়তো চিন্তা করবেন যত দ্রুত সম্ভব প্লেটগুলো পরিষ্কার করবেন। কিন্তু আপনি কি কখনোই অসীম সংখ্যক প্লেট পরিষ্কার করা শেষ করতে পারবেন ? চিন্তা করতে থাকুন…..

ইনফিনিট হোটেল প্যারাডক্স বা হিলবার্ট হোটেল

এমন একটি হোটেল কল্পনা করুন যেখানে অসীম সংখ্যক কক্ষ রয়েছে। এবং অসীম সংখ্যক কক্ষে অসীম সংখ্যক পর্যটক রয়েছে । একদিন হোটেলে নতুন একজন পর্যটক এসেছে যার একটি রুম প্রয়োজন। হোটেল ম্যানাজার রুম ১-এর ব্যক্তিকে রুম ২-এ, রুম ২-এর ব্যক্তিকে রুম ৩-এ……………ইনফিনিটি পর্যন্ত নিয়ে যান। যেহেতু হোটেলে অসীম সংখ্যক রুম রয়েছে তাই প্রত্যেক যাত্রী ১রুম করে সামনে চলে যাওয়ার ফলে নতুন পর্যটকের জন্য প্রথম কক্ষ ফাঁকা হয়ে গেল। কিন্তু নতুন পর্যটক আসার আগে সমস্ত কক্ষ ভর্তি ছিলো। নতুন পর্যটক আগমনের ফলেও হোটেলে মোট পর্যটক সংখ্যা পূর্বে যা ছিলো তাই।

পরদিন হোটেলে নতুন করে অসীম সংখ্যক পর্যটক আসলো। হোটেল ম্যানেজার পুরোনো পর্যটকদের তাদের রুমের দ্বিগুণ সংখ্যক রুমে শিফট করতে বললেন। যার ফলে, রুম ১-এর পর্যটক রুম ২-এ, রুম ২- এর পর্যটক রুম ৪-এ, রুম ৩-এর পর্যটক রুম- 6 এ ………ইনফিনিটিতে চলে যায়। এর ফলে সমস্ত জোড় সংখ্যক রুম ভর্তি হয়ে যাবে এবং বিজোড় সংখ্যক রুম ফাঁকা হয়ে যাবে। যেহেতু হোটেলের রুম সংখ্যা অসীম তাই হোটেলের বিজোড় সংখ্যক রুমের সংখ্যাও অসীম। তাই অসীম সংখ্যক নতুন পর্যটক তারাও হোটেলে শিফট হতে পারবে।

পরদিন হোটেলের অসীম সংখ্যক লোক চেকআউট করলে কি হবে ? যেহেতু বাকি পর্যটকের সংখ্যা অসীম তাই হোটেলে এখনো অসীম সংখ্যক পর্যটক রয়েছে। যদিও অসীম সংখ্যক লোক চেক আউট করেছে।

যদি রুম নাম্বার ৪ থেকে শুরু করে অসীম সংখ্যক পর্যটক চেকআউট করে তাহলে কি হবে ? শুধু মাত্র তিন জন পর্যটক অবশিষ্ট থাকবে। কিন্তু এটি পুরোপুরি অযৌক্তিক। কারণ, প্রথমে অসীম সংখ্যক রুম থেকে অসীম সংখ্যক পর্যটক চেকআউট করার পরে হোটেলে পর্যটক সংখ্যা ছিলো অসীম। কিন্তু দ্বিতীয়বার, যখন ৪নং রুম থকে শুরু করে অসীম সংখ্যক রুম থেকে অসীম সংখ্যক পর্যটক চেকআউট করলো তখন পর্যটক সংখ্যা ছিলো তিন জন। সুতরাং, অসীম থেকে যখন অসীমকে বিয়োগ দেওয়া হচ্ছে তা ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে আপনি যদি ৫ থকে ৩ বিয়োগ করেন তাহলে ফলাফল সব সময় ২ থাকবে। তবে অসীমের ক্ষেত্রে তা ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল দিচ্ছে। তাই এটা পুরোপুরো অযৌক্তিক।

অসীম বলতে আসলে কিছুই নেই। আপনি ইনফিনিটি কে ইনফিনিটি দিয়ে গুণ করলে বিয়োগ করলে ইনফিনিটিই আসবে। কখনোই ফাইনেট আসবেনা। এটা কেবলই আমাদের ধারণা। সুতরাং মহাবিশ্বের অবশ্যই একটা শুরু আছে।

আরো একটি উদাহারণ লক্ষ্য করুন

মনে করুন আপনি দোকানে গেলেন পাউরুটি কিনতে। দোকানের সামনে অসীম সংখ্যক লোক পাউরুটি কিনতে এসেছে। সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে পাউরুটি নিচ্ছে।  আপনিও সবার সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনতে লাগলেন। সমস্যা হচ্ছে আপনি যতই অপেক্ষার প্রহর গুনেন না কেন, আপনি কখনোই পাউরুটি কিনতে পারবেনা না!  ভাবছেন কেন কিনতে পারবেন না ? আপনার সামনে কতজন লোক দাঁড়িয়ে আছে ? অসীম সংখ্যক তাইতো ? এখন লাইলে দাঁড়ানো লোকের সংখ্যা যেহেতু অসীম তাই অসীম সংখ্যক লোকের পাউরুটি কিনা কখনোই শেষ হবেনা, আর আপনার কেনার সুযোগও আসবেন। 

বিষয়টি বুঝতে খুব ব্যাগ পেতে হচ্ছে তাইনা ! কোনো সমস্যা নেই। 

আপনার সামনে দাঁড়ানো লোকের সংখ্যা, ১,২,৩,৪,৫………..অসীম।  

তাহলে, ১ম ব্যক্তি পাউরুটি কিনা শেষ হলে ২য় ব্যক্তি পাউরুটি কিনতে পারবে। ২য়  ব্যক্তির পাউরুটি কিনা শেষ হলে ৩য় ব্যক্তি পাউরুটি কিনতে পারবে, এভাবে অসীম সংখ্যক বার চলতে থাকলো। তাহলে অসীম তো কখনোই শেষ হবেনা! তাই আপনার পাউরুটি কিনার সুযোগও কখনোই আসবেনা।  এই উদাহারণটি মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে চিন্তা করুন।

উদাহারণ স্বরূপ, আমাদের মহাবিশ্ব যদি “X” হয়, আর একে সৃষ্টি করে থাকে “X1”, আবার “X1” কে যদি সৃষ্টি করে “X2” আর এইভাবে যদি অনন্তকাল চলতে থাকে তাহলে “X” কখনোই অস্তিত্বে আসতে পারবে ? না কখনোই পারবেনা ! কেননা “X” অস্তিত্বে আসার জন্য নির্ভর করে “X1″এর উপর, আবার “X1” অস্তিত্বে আসার জন্য নির্ভর করে “X2″এর উপর এবং এভাবে অনন্তকাল চলতে থাকে। “X” অস্তিত্বে আসার জন্য নির্ভর করে অনাদিকাল ধরে চলা সৃষ্ট কিছুর উপর। এইভাবে অনাদিকাল ধরে চলা সৃষ্ট কিছুর উপর নির্ভর করলে “অনবস্থা দোষ”(Infinite regress) দেখা দিবে।  সুতরাং মহাবিশ্ব অস্তিত্বে আসার জন্য অসীম সংখ্যক কারণ বা মহাবিশ্ব অসীম হওয়া পসিবল না। বরং মহাবিশ্বের একটা শুরু আছে, এটা সব সময় অস্তিত্বে ছিলোনা। বিগ ব্যাং থিওরিও আমাদের একই কথা বলে যে মহাবিশ্বের শুরু আছে।

সুতরাং, মহাবিশ্ব কখনোই অসীম হতে পারেনা। কারণ অস্তিত্বে আসার জন্য মহাবিশ্বের একটা শুরু আছে। অস্তিত্বে আসার জন্য যার শুরু থাকে তা কখনো অসীমত্ব ধারণ করতে পারেনা। মহাবিশ্ব যদি অসীম হতো তাহলে এর পৃর্বে অসীম সংখ্যক কারণ থাকতো যার ফলে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হবে বা বর্তমান সময়ে আসবে। কিন্তু কোনো কিছু অস্তিত্বে আসার পেছনে যদি অসীম সংখ্যক কারণের উপর নির্ভরশীল হয় তাহলে তা ইনফিনিটি রিগ্রেস এর কারণে কখনোই বর্তমানে আসতে পারবেনা। যা আমরা উপরের উদাহারণ থেকেই বুঝতে পেরেছি যে, অসীম সংখ্যক কারণ ঘটলে ইনফিনিটি রিগ্রেস ঘটবে, এবং বর্তমানেই আসা সম্ভব না। যার ফলে মহাবিশ্ব কখনোই সৃষ্টি হতোনা। সুতরাং মহাবিশ্ব অসীম নয় বরং সসীম।  

ইনফিনিটি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের মত

এরিস্টটলের মতে, 

ইনফিনিটি অস্তিত্বশীল না, কারণ ইনফিনিটি হলো প্যারাডক্সিক্যাল।

বিখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানি স্টেফিন হকিং তার ওয়েভসাইটে এই বিষয়ে লিখেছেন, 

The conclusion of this lecture is that the universe has not existed forever. Rather, the universe, and time itself, had a beginning in the Big Bang, about 15 billion years ago. – The Beginning of Time, Stephen Hawking. অর্থাৎ, এই বক্তিতা শেষে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছি যে, মহাবিশ্বের অস্তিত্ব চিরকাল বিদ্যমান ছিল না। বরং, মহাবিশ্ব এমনকি স্বয়ং সময়ের সূচনা হয়েছিল বিগ ব্যাংএর মধ্য দিয়ে, প্রায় ১৫ বিলিয়ন বছর পূর্বে।[3]Stephen Hawking

Facebook
Twitter
LinkedIn
Telegram
WhatsApp

2 thoughts on “মহাবিশ্ব কি অসীম?”

Leave a Comment

Your email address will not be published.

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ

সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

Category