বিজ্ঞানফিলোসফি
Trending

মহাবিশ্ব কি নিজেকে নিজে সৃষ্টি করেছে?

বিজ্ঞান

মহাবিশ্ব কি নিজেকে নিজে সৃষ্টি করতে পারে? এটা কি আদৌও সম্ভব যে x প্রারম্ভিকভাবে t সময়ে নিজেকে অস্তিত্বে নিয়ে আসবে যেখানে t’ সময়ে x এর কোনো অস্তিত্বই ছিলো না। ক্লাসিক্যাল ল’ অনুসারে এটি অসম্ভব। এমনকি স্ব-সৃষ্ট বিষয়টা আক্বল দ্বারা চিন্তা করাটাও প্রায় অসম্ভব। তবে র‍্যাডিকেল নাস্তিকদের নতুন ধর্ম ‘কসমোলজি’ র ক্ষেত্রে কি এটি সম্ভব? আজ সেই বিষয়টি নিয়েই আমরা আলোচনা করব।

নোট: সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি আমার ই-বুক দ্য গড হাইপোথিসিস A case for the Existance of Allah বইটি থেকে নেয়া হয়েছে।

Self creation ( স্ব সৃষ্ট )

বিস্তারিত আলোচনার পূর্বে আমরা একটু বেসিক বুঝে নেই। সৃষ্টি বলতে আমরা বুঝি কোনো কিছু অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে উপনীত হওয়া অর্থাৎ কোনো কিছু পূর্বে ছিলো না পরবর্তীতে অস্তিত্বে এসেছে। যদি কোনো কিছু নিজেই নিজের কারণ হয় তবে তাকে একই সময়ে অস্তিত্বে থাকতে হবে কারণ সে তাকে সৃষ্টি করবে এবং একই সময়ে সে অস্তিত্বে থাকতে পারবে না যেহেতু তাকে এখনো সৃষ্টি করা হয়নি। যদি x, y এর কারণ হয় তবে y অস্তিত্বে আসার পূর্বে x এর অস্তিত্ব থাকা আবশ্যকীয়। আবার যদি x,x এর কারণ হয় অর্থাৎ সেল্ফ ক্রিয়েশন তবে x এর অস্তিত্বের পূর্বেই x কে অস্তিত্বে থাকতে হবে একই সময়ে একই সাথে x কে অস্তিত্বে থাকতে হবে এবং তাকে অস্তিত্বে থাকতে হবে না যা বাস্তবিকভাবে অযৌক্তিক এবং বৈপরিত্যমূলক। চিরায়ত যুক্তিবিদ্যার নিয়ম “law of noncontradiction ” অনুযায়ী কোনো কিছু একই সাথে সত্য এবং মিথ্যা হবে না। চলুন এ নিয়ে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

*Law of non contradiction

ফিলোসোফি, মেটাফিজিক্স এবং অন্টোলজিতে Law of non-contradiction বেশ দৃঢ় একটি অবস্থানে রয়েছে। [1]Tahko, T. (2009). The law of non-contradiction as a metaphysical principle. Australasian Journal of Logic, 7. Principle of noncontradiction (PNC) বলতে বোঝায় পারস্পরিক দ্বন্দ্বমূলক কোনো কিছু থাকতে পারে না/ নেই। উদাহরণস্বরুপ,

P → true,

P → False

এখানে P & P একই সাথে সত্য(T) এবং একই সাথে মিথ্যা( F) এ অবস্থান করছে। দুটোই একই সস্তা মিথ্যা এবং সত্য যা অসম্ভব। সহজ কথায়, পারস্পরিক দ্বন্দ্বমূলক কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই, থাকা সম্ভব ও নয় এটাই হচ্ছে Principle of non-contradiction.

এরিস্টটলিয়ান মেটাফিজিক্সে, Principle of non-contradiction কে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে।

1.Ontological : “এটা অসম্ভব যে একই জিনিস একই সময়ে এবং একই বিষয়ে একই জিনিসের অন্তর্গত এবং অন্তর্গত নয়।” [2]Łukasiewicz (1971) p.487

2.মনস্তাত্ত্বিক : “কেউ বিশ্বাস করতে পারে না যে একই জিনিস (একই সময়ে) হতে পারে এবং হতে পারে না।” [3]Whitaker, CWA Aristotle’s De Interpretatione: Contradiction and Dialectic page 184

3. যৌক্তিক : “সমস্ত মৌলিক নীতিগুলির মধ্যে সবচেয়ে নিশ্চিত (certain) নীতি এটাই যে পরস্পর বিরোধী প্রস্তাবগুলি একই সাথে সত্য নয়।”

*Law of non-contradiction is undeniable:

Principle of non-contradiction কে অস্বীকার করা অসম্ভব। কেননা স্বতসিদ্ধ ( Axiom) যুক্তি হিসেবে এটি সত্য। কোনো প্রমাণ বা অপ্রমাণ /অপ্রামান্য কোনো কিছু থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতেও এটি ব্যবহার করতে হবে। থট এক্সপেরিমেন্টঃ

ধরুন, সীমান্ত দাবি করলো ” আমি principle of noncontradiction ” এ বিশ্বাস করিনা। এখন সে যেহেতু এটাতে বিশ্বাস করে না সুতরাং তার বিশ্বাস অনুযায়ী একই সময়ে একই সাথে একটি জিনিস সত্য এবং মিথ্যা হতে পারে অর্থাৎ তার ” বিশ্বাস করা “আর “বিশ্বাস না করা ” এই দুটো জিনিস একই সাথে একই। সুতরাং যখন সে দাবি করছে সে law of noncontradiction এ বিশ্বাস করে না ঠিক তখন ই তার তথ্যানুযায়ী সে একই সাথে law of noncontradiction এ বিশ্বাস করছে। মূল কথা হলো আপনি যেমন চোখ ব্যতীত কোন দেখতে পাবেন না, তেমনই Principle of noncontradiction ব্যতীত কোন কিছু চিন্তা করতে পারবেন না।

যারা Principle of non-contradiction কে অবিশ্বাস করে তাদেরকে উদ্দেশ্য করে ইবনে সিনার একটি মুখরোচক বাণী রয়েছে”,

❝ He must be subjected to the conflagration of fire, since ‘fire’ and ‘not fire’ are one. Pain must be inflicted on him through beating, since ‘pain’ and ‘no pain’ are one. And he must be denied food and drink, since eating and drinking and the abstention from both are one [and the same]. ❞

তাকে অবশ্যই আগুনের প্রজ্বলনে জ্বলতে হবে, যেহেতু ‘আগুন’ এবং ‘আগুন নয়’ এক। প্রহারের মাধ্যমে তাকে ব্যথা দিতে হবে, যেহেতু ‘ব্যথা’ এবং ‘না’ ব্যথা’ এক। এবং তাকে অবশ্যই খাদ্য ও পানীয় থেকে বঞ্চিত করতে হবে, যেহেতু খাওয়া এবং পান করা এবং উভয় থেকে বিরত থাকা এক [এবং একই]।” [4]Avicenna, Metaphysics, I.8 53.13–15 (sect. 12 [p. 43] in ed. Michael Marmura); commenting on Aristotle, Topics I.11.105a4

অর্থাৎ যুক্তিবিদ্যায় এটি অকাট্য ভাবে প্রমানিত একটি যুক্তি যে একই সাথে কোনো কিছু অস্তিত্বে থাকা এবং না থাকা অসম্ভব। দর্শনের দিক থেকে আপনি যাচাই বাছাই করে দেখলে দেখতে পাবেন মহাবিশ্বের নিজেই নিজের কারণ হওয়ার বিষয়টি কতটা অযৌক্তিক এবং রিডিকিউলাস একটা বিষয়। তথাপি কিছু নাস্তিক এবং বিখ্যাত সাইন্স জার্নালিস্ট কোয়ান্টাম কসমোলজি, স্ট্রিং কসমোলজি ইত্যাদি মুখ রোচক শব্দচয়ন এর আড়ালে সাধারণ মানুষের কাছে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে যদিওবা সুস্পষ্ট ভাবে নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করা বিষয়টি যৌক্তিক ভাবে অসম্ভব একটি বিষয়।

self-created universe ( স্ব সৃষ্ট মহাবিশ্ব)

স্ব সৃষ্ট মহাবিশ্ব বিষয় টি দর্শনগত দিক থেকে অদ্ভুত এবং অযৌক্তিক মনে হলেও কিছু তাত্ত্বিক পদার্থবিদ মহাবিশ্বের কারণ এড়াতে বিভিন্ন মডেল প্রস্তাব হরহামেশাই প্রস্তাব করে থাকেন। তন্মধ্যে Richard Gott and Li-Xin Li এই দুজন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ১৯৯৭ সালে একটি গবেষণাপত্রে মহাবিশ্বের প্রথম কার্যকারণ এর সমস্যা সমাধানে দেখানোর চেষ্টা করেন মহাবিশ্বের আসলে কোনো শুরু নেই তবে মহাবিশ্ব অসীম ও নয়। তাহলে কেন বলা হচ্ছে মহাবিশ্বের শুরু নেই? কেননা স্ট্যান্ডার্ড বিগব্যাং মডেল অনুযায়ী সিঙ্গুলারিটি বা শুরুর এককতা বলে একটা কথা আছে অর্থাৎ শুরুর একটি বিন্দু বিদ্যমান। তবে Gott & Li মনে করেন মহাবিশ্বের বাউন্ডারি ক্লোজড টাইমলাইক কার্ভ (CTC) এর মতো। তাদের গবেষণাপত্রে তারা বলেন

  এই গবেষণাপত্রে আমরা উল্লেখ করেছি যে মহাবিশ্ব শুন্য থেকে উৎপত্তি লাভ করেনি বরং নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেছে। আপেক্ষিকতা তত্ত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য নীতিগত ভাবে ক্লোজড টাইমলাইক কার্ভ কে সমর্থন করে। কেন আমরা এটিকে প্রধান কার্যকারণ সমস্যা সমাধানে ব্যবহার করছিনা? অসংখ্য ইনফ্লেশনারী মডেল ব্ল্যাকহোলের ভেতরে, আইন্সটাইন রোজেন ব্রীজ এ টানেলিং এর মাধ্যমে শিশু ইনফ্লেশনারী ইউনিভার্স তৈরিকে সমর্থন করে এবং সেই শিশু মহাবিশ্ব গুলো সহসাই আমাদের মহাবিশ্বের মতো হয়ে যায়। না মহাবিশ্ব কোয়ান্টাম টানেলিং এর মাধ্যমে এসেছে না সিংগুলারিটি থেকে উৎপন্ন হয়েছে বরং মহাবিশ্ব নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেছে। [5]Gott III, J. R., & Li, L. X. (1998). Can the universe create itself?. Physical Review D, 58(2), 023501. P. 39 https://doi.org/10.1103/PhysRevD.58.023501

 

স্ব সৃষ্ট মহাবিশ্ব সূত্রঃ স্লাইড শেয়ার।

উল্লেখিত চিত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি চারটি শিশু মহাবিশ্বকে। ডান দিক থেকে হিসেব করলে এর সিকুয়েন্স দাঁড়ায় A, B, C এবং D. ক্লোজড টাইমলাইক কার্ভ অঞ্চলটি ডায়াগ্রামের একেবারে নিচের দিকে অবস্থান করছে। এই অঞ্চলটি Cauchy Horizon এর মাধ্যমে ভবিষ্যতের বিবর্তনীয় মহাবিশ্বের অঞ্চল থেকে আলাদা থাকে। এই চারটি শিশু মহাবিশ্বের ডায়াগ্রাম অনুসারে ইউনিভার্স A এবং D কোনো শিশু মহাবিশ্বের জন্ম দেয়নি। ইউনিভার্স C সৃষ্টি করেছে ইউনিভার্স D কে। ইউনিভার্স B বাকি তিনটি ইউনিভার্স কে ( A,,C,D) সৃষ্টি করেছে এবং ইউনিভার্স B নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেছে শেষাংকে স্থানকালের বক্ররেখা এতো বেশি যে তা ক্লোজড টাইমলাইক কার্ভ এ পরিণত হয়েছে।

ক্লোজড টাইমলাইক কার্ভঃ

আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বে বলা হয়েছে, মহাকর্ষ স্থানকালকে বাঁকিয়ে ফেলতে পারে। খুব শক্তিশালী একটা মহাকর্ষক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব হলে (একটা ঘূর্ণমান ব্ল্যাকহোল যেমনটা করতে পারে) সেটা স্থানকাল বা স্পেসটাইমকে এমনভাবে বাঁকাতে পারবে যে, সেটা বেঁকে এসে নিজের সঙ্গেই যুক্ত হবে। ফলে একটা ক্লোজড টাইমলাইক কার্ভ (সিটিসি) তৈরি হবে। মূলত এটি একটি কজাল লুপ। কার্যকারণ লুপ হল টাইম ট্রাভেলের একটি প্যারাডক্স। এক্ষেত্রে ভবিষ্যতে করা কাজের প্রভাব অতীতের ইভেন্ট কে প্রভাবিত করে, আবার অতীত এ করা কাজের প্রভাব ভবিষ্যতের ইভেন্ট কে প্রভাবিত করে। উভয় ঘটনাই তখন একই স্থানকালে বিদ্যমান, যার ফলে তাদের উৎপত্তি নির্ধারণ করা যায় না। তবে ক্লোজ টাইমলাইক কার্ভ হলেও এর শুরু ছিলো না এমন কখনোই না কেননা ক্লোজ টাইমলাইক কার্ভ তৈরিই হয় স্থানকালের শুরুর বিন্দু থেকে বৃদ্ধি পেয়ে পুনরায় সেই বিন্দুতে এসে শেষ হওয়ার ফলে। [6]Gödel, K. (1949). An example of a new type of cosmological solutions of Einstein’s field equations of gravitation. Reviews of modern physics, 21(3), 447.

আমরা আগে দেখেই নেই ক্লোজ টাইমলাইক বলতে কি বুঝতে চাচ্ছি,

থ্রি-ডায়মেনশনাল স্পেসের দুটি টুকরাকে পরস্পর ছেদ করে সেটাকে বলা হয় একটি ঘটনার “World Line”. প্রতিটি ঘটনার ওয়ার্ল্ড লাইন লাইট কোনের ভেতরেই অবস্থান করবে যে লাইট কোনটি ঘটনা অতিক্রম করছে। যে বিশ্বরেখা আলোর থেকে ধীর গতির বস্তুকে ব্যাখ্যা করে সেটিকে বলা হয় ” টাইমলাইক” আপনি যদি কোনো ভাবে আলোর চেয়ে দ্রুতগতি ভ্রমণ করতে পারেন তবে আপনার ওয়ার্ল্ডলাইন হয়ে যাবে “স্পেসলাইক”! কেনোনা এটি তখন টাইমের তুলনায় অনেক বেশি স্পেসকেই দখল করবে। আপনি যদি পুরোপুরি আলোর গতিতেই ভ্রমণ করেন তাবে আপনার ওয়ার্ল্ডলাইনকে বলা হবে ” লাইটলাইক” [7]From Eternity to Here: The Quest for the Ultimate Theory of Time , Sean Carroll , Dutton, New York, 2010.

এখন মূল বিষয় হচ্ছে ক্লোজড টাইমলাইক কার্ভ আসলে সম্ভব কিনা বা এটা কোনো ভাবে আমাদের মহাবিশ্ব কে শুরুহীনতার দিকে নিয়ে যায় কিনা। সহজ উত্তর হচ্ছে না! কেননা আমাদের মহাবিশ্ব রোটেশনাল কোনো অবজেক্ট নয় এবং আমাদের মহাবিশ্বে সিঙ্গুলারিটি তে অর্থাৎ মহাবিশ্বের জন্মের সময়কালে কোনো পদার্থের ভর এতো বেশি ছিলো না যে তারা স্থানকাল কে বাকিয়ে সম্পূর্ণ ৩৬০ ডিগ্রি কার্ভ তৈরি করবে। এমনকি আমাদের কাছে বহু পরীক্ষণযোগ্য এবং ফলসিফায়েবল প্রমাণ রয়েছে যে মহাবিশ্বের একটি সুচনা রয়েছে।[8]Chow, Tai L. (2008). Gravity, Black Holes, and the Very Early Universe: An Introduction to General Relativity and Cosmology. New York: Springer.  ক্লোজড টাইমলাইক কার্ভ অনেকাংশে টাইম ট্রাভেলের সাথে যুক্ত। ক্লোজড টাইমলাইক কার্ভ এর সাথে জড়িত রয়েছে পদার্থবিজ্ঞান এর অনবদ্য কিছু জিনিসপাতি। যেমন ধরুন ওয়ার্মহোল। এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় আমরা আরও গভীরভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখব এগুলোর বাস্তব সম্ভাবনা কতটুকু।

ওয়ার্মহোল

ওয়ার্মহোল হল তাত্ত্বিকভাবে মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি স্থানের বা স্থান-কালের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করার জন্য তৈরি একটি টানেল স্বরূপ। এটির মাধ্যমে মহাবিশ্বের একটি স্থান থেকে অন্য একটি স্থানে কম সময়ের মাঝেই ভ্রমণ করা যায়। কেননা এটি প্রায় কয়েক বিলিয়ন আলোকবর্ষের পার্থক্যে থাকা মহাবিশ্বের দুটি বিন্দুকে মাত্র কয়েক মিটারের একটি টানেলের মাধ্যমে সংযুক্ত করে দিতে পারে!! এদিকে আমরা ফার্মাটের সূত্র থেকে জানি যে, আলো সর্বদা সরল পথে চলে। তাই ওই দুই বিন্দুর একস্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে আলোর কয়েক বিলিয়ন বছর সময় লাগলেও, আপনি ওয়ার্মহোল ব্যাবহার করে অতি সহজেই মাত্র কয়েক মুহূর্তেই এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে চলে যেতে পারবেন।

ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণবিবর হচ্ছে স্পেস টাইমের মধ্যকার এমন একটি অংশ, যেখানে মহাকর্ষের প্রভাব এতই বেশি যে, সেখান থেকে মহাবিশ্বে সর্বোচ্চ বেগে চলমান তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ বা আলো পর্যন্ত মুক্তি পেয়ে ফিরে আসতে পারে না। এমনকি ব্ল্যাকহোলের মাঝে হারিয়ে যাওয়া আলো বা নক্ষত্রের কোনও প্রকার হদিস বের করা আজ অবধি সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে ওয়ার্ম হোল হচ্ছে একটি থিওরিটিকাল প্যাসেজ অথবা টানেল যা স্পেসটাইমে এক অবস্থান থেকে অন্য অবস্থানে যেতে একটি শর্টকাট তৈরি করে এবং যার ফলস্বরূপ ইউনিভার্সের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ভ্রমন টা সময়ের সাথে কমে যায়।

ওয়ার্মহোল এর আরেক নাম আইন্সটাইন রোজেন ব্রীজ। ওয়ার্মহোল হল এক ধরনের সেতু বা সুরঙ্গ যা মহাশূন্যে সময়ের কাল্পনিক চিত্র বর্ননা করে। এর দুই প্রান্ত মহাশূন্যের সময়ের দুই অবস্থানে থাকে। চারের চেয়ে বেশি মাত্রায় এটি অদৃশ্য। সহজ ভাষায় এটা হল দুই মাত্রার তলে দেখা মহাশূন্যের সময়। তল টি যদি তৃতীয়মাত্রায় ভাজ হয়ে আসে তখন ওয়ার্মহোল সেতুর মত দেখায়।

 

সহজ কথায়, ওয়ার্মহোল বলতে এমন একটি কাল্পনিক সুড়ঙ্গকে বুঝানো হয় যার সাহায্যে ব্ল্যাকহোল এবং হোয়াইটহোলের সংযোগ ঘটেছে। স্থানকালের অসীম ঘনত্বের চুড়ান্ত পর্যায় হচ্ছে সিঙ্গালুরাটি যা আমরা ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্রে রয়েছে বলে ধারণা করে থাকি। ধারণা করা হয় এটি স্থান-কাল চাদরে সর্বোচ্চ পরিমাণ বক্রতা ঘটাতে সক্ষম। তাই স্থানকালের দুটি ভিন্ন বিন্দুতে এই সিঙ্গালুরাটি থাকলে তারা যদি একে অপরের সংস্পর্শে এসে মিথস্ক্রিয়ায় জড়ায় তবে একটি ওয়ার্মহোলের সৃষ্টি হবে। এখানে ব্ল্যাকহোল ও হোয়াইটহোলের জন্য স্থানকালে দুটি সিঙ্গালুরাটি বিন্দুর সৃষ্টি হয় এবং এরা পরস্পর মিথস্ক্রিয়া সৃষ্টির মাধ্যমেই ওয়ার্মহোলের জন্ম হয়। [9]Focus: Wormhole Construction: Proceed with Caution”. Physical Review Focus. Vol. 2. American Physical Society. 1998-08-03. p. 7.

আইনস্টাইন-রোসেন ব্রিজ সমীকরণ ব্যবহার করে তাত্ত্বিকভাবে শোয়ার্ডসচাইল্ড ওয়ার্মহোল (Schwarzschild wormhole) পাওয়া যায় । ১৯৮৮ সালে কিপ থর্ন (Kip Thorne) ট্রান্সভার্সিবল ওয়ার্মহোলের (Transversible Wormhole) ধারণা দিয়েছিলেন। অনেক কল্পবিজ্ঞানের গল্পে এই ওয়ার্মহোলের মধ্য দিয়ে সময় ভ্রমণের (Time Travel) কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু আদতে সেই সময় ভ্রমণের প্রক্রিয়া অনেক অনেক জটিল। যেসকল ওয়ার্মহোল এর কথা বলা যায় তাত্ত্বিক ভাবেও সেগুলো খুবই ছোট। প্রাইমর্ডিয়াল ওয়ার্মহোল (Primordial Wormhole) আসলে আকারে আণুবীক্ষণিক, এর আকার আনুমানিক ১০^(-৩৩) সেন্টিমিটার! তাছাড়া এর স্থিতিশীলতা নিয়েও অনেক প্রশ্ন থেকে যায়। আইনস্টাইন-রোসেন ওয়ার্মহোলগুলি খুব দ্রুত সংকুচিত হয়ে যায় বলে এর মধ্য দিয়ে সময়-ভ্রমণ অসম্ভব। কেননা এগুলো সৃষ্টি হওয়ার সাথে সাথেই ধ্বংস হয়ে যায়। [10]what is a wormhole theory Nola Taylor Tillman , Ailsa Harvey published January 13, 2022কিপ থর্ন এর মতে ওয়ার্মহোল কে স্ট্যাবিলাইজ রাখতে ইক্সোটিক ম্যাটারের অস্তিত্ব থাকতে থাকবে।কোয়ান্টাম ম্যাকানিক্স অনুসারে এ্যাক্সোটিক ম্যাটার নেগেটিভ ভর সম্পন্ন এবং গ্রাভীটিতে এটা আকর্ষনের পরিবর্তে বিকর্ষিত হয়। আর একটা ওয়ার্মহোলের স্ট্যাবিলিটির জন্য এটার উপস্হিতি প্রয়োজন কেননা এটার মাধ্যমে একটা এ্যান্টিগ্রাভীটি ফোর্স কাজ করবে এবং বিস্ফোরন রোধ করবে যেটা তখন একে ব্লাক হোলে পরিণত করবে। এই এ্যাক্সোটিক ম্যাটার আমাদের চেনা জানা ফিজিক্সের দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না তাছাড়া এর বাস্তব অস্তিত্ব এখনো পাওয়া যায় নি। মূলত ওয়ার্মহোলের ক্ষেত্রে প্রয়োজন এন্টি গ্র‍্যাভিটন কণা যা কথিত গ্র‍্যাভিটন কণার বিপরীত, যদিও গ্র‍্যাভিটন কণা ই এখনো হাইপোথিসিস এর কোনো পরীক্ষণমূলক বাস্তব প্রমাণ নেই। [11]Rothman, T., Boughn, S. Can Gravitons be Detected?. Found Phys 36, 1801–1825 (2006). https://doi.org/10.1007/s10701-006-9081-9আইন্সটাইন রোজেন ব্রীজ অনুযায়ী Primordial wormhole সৃষ্টি হওয়ার সাথে সাথেই ধ্বংস হয়ে যাবে। এছাড়াও যদি ধরেও নেই প্রাইমোর্ডিয়াল ওয়ার্মহোল সম্ভব তবুও ট্রাভার্সেবল ওয়ার্মহোল অর্থাৎ ভ্রমণ এর জন্য প্রযোজ্য ওয়ার্মহোল তৈরি করাটা অসম্ভব। কেননা ওয়ার্মহোল কে বড় করতে গেলে সময়ের দুদিক থেকে আসা শক্তি ( ধনাত্মক – ঋণাত্বক) এক সময়কাল থেকে অন্য সময়কালে চক্রাকারে ঘুরতে থাকবে যার ফলে সৃষ্টি হওয়ার সাথে সাথেই ওয়ার্মহোল ধ্বংস হয়ে যাবে। এছাড়াও কসমিক স্ট্রিং দিয়ে ক্লোজড টাইমলাইক কার্ভ তৈরি করা বা হওয়াটাও অসম্ভব। [12]Deser, S., Jackiw, R., & ‘t Hooft G (1992). Physical cosmic strings do not generate closed timelike curves. Physical review letters, 68(3), 267–269. … Continue reading

প্যারাডক্স এবং দর্শনগত বিশ্লেষণ

ক্লোজড টাইমলাইক কার্ভ ব্যবহার করে টাইম ট্রাভেলের বিষয় টা অনেক প্যারাডক্সের সৃষ্টি করে। তন্মধ্যে অন্যতম একটি প্যারাডক্স বা দ্বন্দ্ব হচ্ছে গ্র‍্যান্ডফাদার প্যারডক্স। এই প্যারাডক্স অনুযায়ী, একজন টাইম ট্রাভেলার সময় ভ্রমণ করে অতীতে গেল এবং অতীতে গিয়ে সে তার দাদা কে হত্যা করলো, এখন যদি সে অতীতে তার দাদার বিয়ের আগে দাদাকে হত্যা করে তবে তার বাবার জন্মও হবে না তাহলে তো তার নিজের জন্ম হওয়ায় সম্ভব নয় সেক্ষেত্রে টাইম ট্রাভেল করে তার অতীতে আসাটাও তো অসম্ভব যেহেতু তার দাদাকে মেরে ফেলার ফলে তার অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে যায়। সহজভাবে এটাই গ্র‍্যান্ডফাদার প্যারাডক্স। এসব প্যারাডক্সের ভিত্তিতে স্টিফেন হকিং তার ঘটনাপঞ্জি সংরক্ষণ তত্ত্ব ( chronology protection conjecture) প্রস্তাব করেন। তার এই তত্ত্ব অনুযায়ী পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র গুলো ক্লোজড টাইমলাইক কার্ভ তৈরি হতে বাধা দিবে এমনকি সময় ভ্রমণ কেও প্রতিরোধ করবে। 1991 সালের জানুয়ারিতে স্টিফেন হকিং পূর্বে দেওয়া উদ্ধৃতি সহ একটি বক্তৃতা উপস্থাপন করেছিলেন। পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলি অতীতে সময় ভ্রমণকে বাধা দেয় এই হাইপোথিসিসকে লেবেল করার জন্য তিনি “ক্রোনোলজি প্রোটেকশন হাইপোথিসিস” শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন তিনি বলেন,

 একটি ক্রোনোলজি প্রোটেকশন এজেন্সি আছে বলে মনে হচ্ছে যা অতীতে ভ্রমণ রোধ করে ইতিহাসবিদদের জন্য বিশ্বকে নিরাপদ করে। যা ঘটতে দেখা যাচ্ছে তা হল অনিশ্চয়তার নীতির প্রভাব অতীতে ভ্রমণ করলে প্রচুর পরিমাণে বিকিরণ হতে পারে।

এই বিকিরণ হয় স্থান-কালকে এতটাই বিকৃত করবে যে সময়ের মধ্যে ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না, অথবা এটি মহাবিস্ফোরণ এবং বিগ ক্রাঞ্চের মতো এককতায় স্থান-কালকে শেষ করে দেবে। যেভাবেই হোক, আমাদের অতীত মন্দ মনের ব্যক্তিদের থেকে নিরাপদ থাকবে। ক্রোনোলজি প্রোটেকশন হাইপোথিসিসটি সাম্প্রতিক কিছু গণনা দ্বারা সমর্থিত যা আমি এবং অন্যান্য গবেষকেরা করেছি। ❞ [13]and Other Essays by Stephen Hawking, Essay: 13: The Future of the Universe, (Asterisk footnote: “Darwin lecture given at the University of Cambridge in January 1991.”), Start page 141, Quote Page … Continue reading

১৯৯২ সালের ১৫ ই জুলাই হকিং তার ঘটনাপঞ্জি সংরক্ষণ তত্ত্ব নিয়ে আমেরিকার অন্যতম প্রভাবশালী জার্নাল ফিজিক্যাল রিভিউ তে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। উক্ত গবেষণাপত্রে সামগ্রিক আলোচনা শেষ তিনি বলেন,

 যেভাবেই হোক, কালানুক্রমিক সুরক্ষা অনুমানকে বিশ্বাস করার তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে বলে মনে হচ্ছে: পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলি বক্ররেখার মতো বন্ধ সময়ের ( ক্লোজড টাইমলাইক কার্ভ) উপস্থিতি রোধ করে। এই হাইপোথিসিস এর পক্ষে শক্তিশালী পরীক্ষামূলক প্রমাণও রয়েছে যে আমরা ভবিষ্যতে পর্যটকদের দলীয়ভাবে আক্রমণ করিনি।  [14]1992 July 15, Physical Review D, Volume 46, Issue 2, “Chronology protection conjecture” by S. W. Hawking https://doi.org/10.1103/PhysRevD.46.603

সময় ভ্রমণের এই দ্বন্দ্বমূলক সমস্যা গুলো এড়াতে কিছু তাত্ত্বিক রা বহুমহাবিশ্বের ধারণা অবতারণা করেন। তারা বলেন হতে পারে সময় পর্যটক যে অতীতে গিয়ে উপস্থিত হবেন তা হচ্ছে তার অতীতের একটি কার্বন কপি মাত্র। অর্থাৎ লোকাল ইউনিভার্সে তার অতীত সংরক্ষিত থাকলেও বহুমহাবিশ্বের মধ্যে একটিতে তার অনুরুপ নকল একটি অতীত থাকবে যা তিনি পরিবর্তন করতে পারবেন। যদিও বা বহুমহাবিশ্বের ধারণাও শুধুমাত্রই অনুমান এবং এর কোনো পরীক্ষামূলক প্রমাণ নেই। এমনকি অতীতে সময় ভ্রমণ শারীরিকভাবে সম্ভব কিনা তা না জেনেও, মডেল লজিক ব্যবহার করে দেখানো সম্ভব যে অতীত পরিবর্তনের ফলে একটি যৌক্তিক দ্বন্দ্ব হয়। যদি এটি অপরিহার্যভাবে সত্য হয় যে অতীত একটি নির্দিষ্ট উপায়ে ঘটেছে, তবে অতীত অন্য কোনও উপায়ে ঘটতে পারে এ বিষয়টি মিথ্যা এবং অসম্ভব। যার ফলে সময় ভ্রমণ অসম্ভব। [15]Norman Swartz (2001), Beyond Experience: Metaphysical Theories and Philosophical Constraints, University of Toronto Press, pp. 226–227

প্রফেসর Richard Gott & Li Xin Li এর স্ব সৃষ্ট মহাবিশ্বের মডেলের মূল ধারণা বা ফান্ডামেন্টাল প্যারামিটার হচ্ছে ক্লোজড টাইমলাইক কার্ভ। যদিও বা ক্লোজড টাইমলাইক কার্ভ তৈরি হলেও তা মহাবিশ্বের শুরুকে প্রভাবিত করবে না কেননা আমরা জানি মহাবিশ্বের শুরু রয়েছে এবং মহাবিশ্ব ঘুর্নায়মান কোনো কিছু নয়। সম্পূর্ণ আলোচনায় আমরা দেখলাম ক্লোজড টাইমলাইক কার্ভ তৈরি হওয়াটা খুবই অসম্ভব একটি বিষয়। সেক্ষেত্রে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সময় ভ্রমণের বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করেছি। টাইম ট্রাভেল এবং ক্লোজড টাইমলাইক কার্ভ পদার্থবিজ্ঞানের একটি ইন্টারেস্টিং বিষয়। যদিওবা এটি প্রমাণ করে না যে মহাবিশ্ব নিজেকে নিজে সৃষ্টি করেছে। স্ব সৃষ্ট বিষয়টি যৌক্তিকভাবে অসম্ভব এবং পদার্থবিজ্ঞান ও এর অনুমোদন দেয় না।

 

 

References

References
1 Tahko, T. (2009). The law of non-contradiction as a metaphysical principle. Australasian Journal of Logic, 7.
2 Łukasiewicz (1971) p.487
3 Whitaker, CWA Aristotle’s De Interpretatione: Contradiction and Dialectic page 184
4 Avicenna, Metaphysics, I.8 53.13–15 (sect. 12 [p. 43] in ed. Michael Marmura); commenting on Aristotle, Topics I.11.105a4
5 Gott III, J. R., & Li, L. X. (1998). Can the universe create itself?. Physical Review D, 58(2), 023501. P. 39 https://doi.org/10.1103/PhysRevD.58.023501
6 Gödel, K. (1949). An example of a new type of cosmological solutions of Einstein’s field equations of gravitation. Reviews of modern physics, 21(3), 447.
7 From Eternity to Here: The Quest for the Ultimate Theory of Time , Sean Carroll , Dutton, New York, 2010.
8 Chow, Tai L. (2008). Gravity, Black Holes, and the Very Early Universe: An Introduction to General Relativity and Cosmology. New York: Springer.
9 Focus: Wormhole Construction: Proceed with Caution”. Physical Review Focus. Vol. 2. American Physical Society. 1998-08-03. p. 7.
10 what is a wormhole theory Nola Taylor Tillman , Ailsa Harvey published January 13, 2022
11 Rothman, T., Boughn, S. Can Gravitons be Detected?. Found Phys 36, 1801–1825 (2006). https://doi.org/10.1007/s10701-006-9081-9
12 Deser, S., Jackiw, R., & ‘t Hooft G (1992). Physical cosmic strings do not generate closed timelike curves. Physical review letters, 68(3), 267–269. https://doi.org/10.1103/PhysRevLett.68.267
13 and Other Essays by Stephen Hawking, Essay: 13: The Future of the Universe, (Asterisk footnote: “Darwin lecture given at the University of Cambridge in January 1991.”), Start page 141, Quote Page 154, Bantam Books, New York
14 1992 July 15, Physical Review D, Volume 46, Issue 2, “Chronology protection conjecture” by S. W. Hawking https://doi.org/10.1103/PhysRevD.46.603
15 Norman Swartz (2001), Beyond Experience: Metaphysical Theories and Philosophical Constraints, University of Toronto Press, pp. 226–227

Asief Mehedi

Assalamualaikum to all.My name is Asief Mehedi . I am an informal philosophy student. Let's talk about comparative theology, we work to suppress atheism. Help us to suppress atheism and come forward to establish peace.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button